৩য় ও ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারী কারা: সরকারি চাকরির গ্রেড ধারণা

৩য় ও ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারী কারা: সরকারি চাকরির গ্রেড ধারণা

বাংলাদেশে সরকারি চাকরি মানেই নিরাপত্তা, সম্মান এবং স্থায়িত্ব। তবে সরকারি চাকরির পদমর্যাদা ও গ্রেড নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে এখনও অনেক প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারী বলতে কাদের বোঝানো হয়, বর্তমানে তাদের গ্রেড কী, সুযোগ-সুবিধা কতটুকু—এসব বিষয় পরিষ্কারভাবে জানা জরুরি। সরকারি চাকরি সংশ্লিষ্ট এই তথ্যগুলো জানা থাকলে চাকরির আবেদন, ক্যারিয়ার পরিকল্পনা এবং সামাজিক বাস্তবতা বোঝা অনেক সহজ হয়। তাই আজ আমরা সহজ বাংলা ভাষায় বিস্তারিতভাবে আলোচনা করবো সরকারি চাকরির গ্রেড, বিশেষ করে ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের পরিচয়, কাজ, যোগ্যতা, বেতন ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে।

২০১৫ সালের জাতীয় বেতন স্কেল কার্যকর হওয়ার পর সরকারিভাবে ‘শ্রেণী’ শব্দটি আর ব্যবহার করা হয় না। এখন সব সরকারি কর্মচারীকে ১ থেকে ২০ নম্বর গ্রেডে ভাগ করা হয়েছে। তবুও বাস্তবতা হলো, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, দাপ্তরিক আলোচনা এবং সাধারণ কথাবার্তায় ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণী শব্দ দুটি এখনও বহুল প্রচলিত। এই কারণে নতুন চাকরি প্রার্থীদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। এই লেখায় সেই বিভ্রান্তি দূর করার চেষ্টা করা হয়েছে।

আরও জানতে পারেনঃ ২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষে কৃষি গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষার ফল প্রকাশ

সরকারি চাকরিতে গ্রেড পদ্ধতির সংক্ষিপ্ত ধারণা

বাংলাদেশের জাতীয় বেতন স্কেল অনুযায়ী মোট ২০টি গ্রেড রয়েছে। ১ম গ্রেড সবচেয়ে উচ্চপদস্থ এবং ২০তম গ্রেড সবচেয়ে নিম্নপদস্থ কর্মচারীদের জন্য নির্ধারিত। প্রতিটি গ্রেডের জন্য নির্দিষ্ট মূল বেতন, বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট এবং বিভিন্ন ভাতা নির্ধারিত থাকে। গ্রেড যত উপরের দিকে যায়, দায়িত্ব, ক্ষমতা ও বেতন তত বেশি হয়।

গ্রেডিং পদ্ধতির মূল উদ্দেশ্য হলো সকল সরকারি কর্মচারীর জন্য একটি সুষম ও স্বচ্ছ বেতন কাঠামো নিশ্চিত করা। এতে পদমর্যাদা অনুযায়ী বৈষম্য কমে এবং কাজের স্বীকৃতি স্পষ্ট হয়।

৩য় ও ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারী কারা?

বর্তমান গ্রেড কাঠামো অনুযায়ী, সরকারি চাকরিতে ১১ থেকে ১৬তম গ্রেডভুক্ত কর্মচারীদের সাধারণভাবে ৩য় শ্রেণীর কর্মচারী বলা হয়। অন্যদিকে ১৭ থেকে ২০তম গ্রেডভুক্ত কর্মচারীরা পরিচিত ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারী হিসেবে।

যদিও এগুলো এখন আর সরকারি পরিভাষা নয়, তবুও বোঝার সুবিধার জন্য এই শ্রেণীবিভাগ এখনও ব্যবহৃত হয়। চাকরির বিজ্ঞপ্তি পড়ার সময় এই ধারণা জানা থাকলে পদটির অবস্থান সহজে বোঝা যায়।

গ্রেড অনুযায়ী পদবী ও শ্রেণী: একটি সহজ টেবিল

পুরাতন শ্রেণী বর্তমান গ্রেড প্রধান পদসমূহ
৩য় শ্রেণী ১১–১৬ গ্রেড অফিস সহকারী কাম-কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক, হিসাব সহকারী, ডাটা এন্ট্রি অপারেটর, স্টোর কিপার, ড্রাইভার, টেকনিশিয়ান
৪র্থ শ্রেণী ১৭–২০ গ্রেড অফিস সহায়ক (MLSS), নিরাপত্তা প্রহরী, মালি, পরিচ্ছন্নতা কর্মী, রান্নাকারী, মেসওয়েটার

এই টেবিলটি দেখে সহজেই বোঝা যায় কোন পদ কোন গ্রেডের অন্তর্ভুক্ত এবং সেটি ৩য় না ৪র্থ শ্রেণীর মধ্যে পড়ে।

আরও জানতে পারেনঃ বাংলাদেশে IPL সম্প্রচার বন্ধ, বিসিসিআই কতটা আর্থিক চাপে পড়বে?

৩য় শ্রেণীর কর্মচারীদের দায়িত্ব ও কাজের ধরন

৩য় শ্রেণীর কর্মচারীরা মূলত দাপ্তরিক ও কারিগরি কাজে নিয়োজিত থাকেন। এদের কাজ অফিস পরিচালনার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফাইল ব্যবস্থাপনা, ডাটা সংরক্ষণ, হিসাব সংক্রান্ত কাজ, গাড়ি চালনা বা যন্ত্রপাতি পরিচালনার মতো কাজ এদের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়।

প্রধান পদ ও কাজের বিবরণ

  • অফিস সহকারী কাম-কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক: অফিসের চিঠিপত্র টাইপ করা, ফাইল আপডেট রাখা এবং কম্পিউটারভিত্তিক কাজ করা।

  • হিসাব সহকারী: অফিসের দৈনন্দিন আয়-ব্যয়ের হিসাব রাখা এবং বিল ভাউচার প্রস্তুত করা।

  • ডাটা এন্ট্রি অপারেটর: বিভিন্ন তথ্য সফটওয়্যারে এন্ট্রি করা ও ডাটাবেস ম্যানেজ করা।

  • ড্রাইভার (গ্রেড ১৫/১৬): সরকারি যানবাহন নিরাপদে পরিচালনা করা।

  • টেকনিশিয়ান: বিদ্যুৎ, যন্ত্রপাতি বা কারিগরি সমস্যার সমাধান করা।

৩য় শ্রেণীর কর্মচারীদের শিক্ষাগত যোগ্যতা

৩য় শ্রেণীর অধিকাংশ পদের জন্য ন্যূনতম এইচএসসি (HSC) পাস প্রয়োজন হয়। অনেক ক্ষেত্রে ডিপ্লোমা, ট্রেড কোর্স বা স্নাতক ডিগ্রিও চাওয়া হয়। কম্পিউটার সংশ্লিষ্ট পদের জন্য মৌলিক কম্পিউটার জ্ঞান বাধ্যতামূলক।

৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের দায়িত্ব ও কাজের ধরন

৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারীরা মূলত অফিসের সহায়ক ও সেবামূলক কাজে নিয়োজিত থাকেন। অফিসের দৈনন্দিন কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখতে এদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা, কাগজপত্র আনা-নেওয়া ইত্যাদি কাজ এদের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়।

প্রধান পদ ও কাজের বিবরণ

  • অফিস সহায়ক (MLSS): অফিসের ফাইল আনা-নেওয়া, চা-পানি সরবরাহ এবং ছোটখাটো সহায়ক কাজ।

  • নিরাপত্তা প্রহরী: অফিস বা সরকারি স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

  • মালি: সরকারি ভবন বা আবাসিক এলাকার বাগান পরিচর্যা করা।

  • পরিচ্ছন্নতা কর্মী: অফিস ও আশপাশ পরিষ্কার রাখা।

  • মেসওয়েটার ও রান্নাকারী: সরকারি গেস্ট হাউস বা মেসে খাবার সংক্রান্ত কাজ করা।

৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের শিক্ষাগত যোগ্যতা

৪র্থ শ্রেণীর পদের জন্য সাধারণত জেএসসি (JSC) বা এসএসসি (SSC) পাশ হলেই যোগ্যতা হিসেবে ধরা হয়। অনেক ক্ষেত্রে শারীরিক সক্ষমতা এবং বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।

৩য় ও ৪র্থ শ্রেণীর মধ্যে মূল পার্থক্য

শিক্ষাগত যোগ্যতা

৩য় শ্রেণীর জন্য তুলনামূলক বেশি শিক্ষাগত যোগ্যতা প্রয়োজন, যেখানে ৪র্থ শ্রেণীর জন্য কম যোগ্যতাই যথেষ্ট।

কাজের প্রকৃতি

৩য় শ্রেণীর কাজ বেশি দাপ্তরিক ও প্রশাসনিক, আর ৪র্থ শ্রেণীর কাজ শারীরিক ও সেবামূলক।

বেতন ও ভাতা

গ্রেড অনুযায়ী ৩য় শ্রেণীর কর্মচারীরা বেশি মূল বেতন ও সুযোগ-সুবিধা পান।

পদোন্নতির সুযোগ

৩য় শ্রেণীর কর্মচারীদের পদোন্নতির সুযোগ তুলনামূলক বেশি, এমনকি প্রশাসনিক পদ পর্যন্ত উন্নীত হওয়ার সুযোগ থাকে।

সরকারি চাকরিতে বেতন ও সুযোগ-সুবিধা

৩য় ও ৪র্থ শ্রেণীর সকল কর্মচারী সরকারি নিয়ম অনুযায়ী উৎসব ভাতা, বৈশাখী ভাতা, চিকিৎসা ভাতা, পেনশন এবং গ্র্যাচুইটির সুবিধা পেয়ে থাকেন। গ্রেডভেদে এসব সুবিধার পরিমাণে কিছুটা পার্থক্য থাকে, তবে মূল কাঠামো সবার জন্যই প্রযোজ্য।

সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর

৩য় ও ৪র্থ শ্রেণীর পদ কি বাতিল হয়ে গেছে?

না, পদ বাতিল হয়নি। শুধু ‘শ্রেণী’ শব্দটি বাদ দিয়ে গ্রেড পদ্ধতি চালু হয়েছে।

১১তম গ্রেড কোন শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত?

সাধারণভাবে ১১তম গ্রেডকে ৩য় শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত ধরা হয়।

ভবিষ্যতে গ্রেড পদ্ধতিতে পরিবর্তন আসতে পারে কি?

সময়ের প্রয়োজনে সরকার বেতন স্কেল হালনাগাদ করতে পারে, তবে গ্রেড পদ্ধতি বহাল থাকার সম্ভাবনাই বেশি।

শেষ কথা

সবশেষে বলা যায়, বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণী বলতে মূলত ১১ থেকে ২০তম গ্রেডভুক্ত কর্মচারীদের বোঝানো হয়। যদিও এখন অফিসিয়ালি শ্রেণী শব্দটি ব্যবহৃত হয় না, তবুও বাস্তব জীবনে এই ধারণা এখনও গুরুত্বপূর্ণ। চাকরির বিজ্ঞপ্তি বোঝা, ক্যারিয়ার পরিকল্পনা করা এবং নিজের অবস্থান সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পেতে গ্রেড সম্পর্কে জানা অত্যন্ত জরুরি। আধুনিক বাংলাদেশে সরকারি চাকরির মূল পরিচয় এখন গ্রেড ও পদবী, আর সেখানেই কর্মচারীদের প্রকৃত সম্মান নিহিত।

Related posts

Leave a Comment